অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস সম্পর্কে বাংলা রচনা বোর্ড পরীক্ষা, বৃত্তি পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অথবা, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অথবা, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অথবা, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক
অথবা, দারিদ্র্য বিমোচনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা
সংকেত: ভূমিকা, জন্ম ও পরিচয়, শিক্ষা জীবন, শিক্ষকতা পেশায় যোগদান, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান, তেভাগা খামার প্রতিষ্ঠা, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, ইউনূস সেন্টার প্রতিষ্ঠা, তিন শূন্য তত্ত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন, পুরস্কার ও সম্মাননা, প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ, ব্যক্তিগত জীবন, উপসংহার।
ভূমিকা:
যেসকল কীর্তিমান মহামানব বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সুপরিচিত, সম্মানিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন; তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি একাধারে শিক্ষক, উদ্যোক্তা, গরিবের ব্যাংকার, লেখক, নোবেল বিজয়ী গরিবের বন্ধু, সমাজ সংস্কারক প্রভৃতি। বর্তমানে তাঁর অনন্য পরিচয় হচ্ছে তিনি বাংলাদেশ সরকারের ৫ম প্রধান উপদেষ্টা। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিজয়ের পর, ছাত্রদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। অর্থাৎ, তিনি এখন ২১ সদস্যের নবগঠিত সরকারের প্রধান ব্যক্তি।
জন্ম ও পরিচয়:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৪০ সালের ২৮শে জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের বাথুয়া গ্রামে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর পিতার নাম হাজী দুলা মিয়া সওদাগর এবং মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন জহুরি। তাঁর শৈশব কাটে গ্রামে। তবে ১৯৪৪ সালে তাঁর পরিবার চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।
শিক্ষা জীবন:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৪৪ সালে লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ছোটোবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার অধিকারী। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩৯,০০০ ছাত্রের মধ্যে ১৬ তম স্থান অধিকার করেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি একজন সক্রিয় বয় স্কাউট ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারত এবং ১৯৫৫ সালের কানাডায় জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৭ সালে এ ররেণ্য ব্যক্তি পা রাখেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত রাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি অর্থনীতি বিভাগের স্বনামধন্য।
শিক্ষার্থী ছিলেন। আর এ বিভাগ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১৯৬০ সালে বিএ এবং ১৯৬১ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নের জন্য ফুলব্রাইট স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম ইন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (GPED) থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষকতা পেশায় যোগদান:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ড. মুহাম্মদ ইউনুস, নুরুল ইসলাম এবং রেহমান সোবহানের অর্থনৈতিক গবেষণায় গবেষণা সহকারী হিসেবে অর্থনীতি ব্যুরোতে যোগদান করেন। এরপর এই মহান ব্যক্তি ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। একই সময়ে তিনি একটি লাভজনক প্যাকেজিং কারখানা স্থাপন করেন। ১৯৬৯-১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি মার্ফিসবোরোতে মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে নিয়োজিত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে তিনি হতবাক হয়ে যান। আর বিদেশের মাটিতেই নিজের সবটুকু দিয়ে দেশমাতাকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে অনুরোধ করেন, যেন তারা পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা প্রদানে বিরত থাকে। আর এ লক্ষ্যে তিনি একটি কমিটি গঠন করেন। এছাড়াও অন্যান্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার পরিচালনা করেন। এমনকি তিনি তাঁর ন্যাশভিলের বাড়ি থেকে 'বাংলাদেশ নিউজ লেটার' প্রকাশ করতেন। যুদ্ধে বাংলাদেশ জয়লাভ করার পর তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে যোগদান করেন।
তেভাঙ্গা খামার প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। এই নৈতিকতার ঘটনাটি ড. মুহাম্মদ ইউনুসের মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধন করে। তিনি দরিদ্র মানুষের জীবনকে কষ্ট উপলব্ধি করেন এবং তাদের খাদ্য পরিবেশনে সচেষ্ট হন। এ সময়ে তিনি গবেষণার উদ্দেশ্যে গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রকল্প চালু করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি তেভাঙ্গা খামার প্রতিষ্ঠা করেন। যা পরবর্তীতে সরকার প্যাকেজ প্রোগ্রামের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রকল্পটি আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর সহকর্মীদের 'গ্রাম সরকার' কর্মসূচি গ্রহণ করেন। যেটি ১৯৭৫ এর দশকের শেষের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক গৃহীত হয়। এই কর্মসূচির অধীনে ৪০,০০০ গ্রামে ৪০,০০০টি গ্রাম সরকার গঠিত হয়, যা ক্ষুদ্র ঋণও সরবরাহ হিসেবে কাজ করে।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা:
১৯৭৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনুস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি জোবরা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সাথে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প কার্যক্রম শুরু করেন। খুব সামান্য ঋণও দরিদ্র মানুষের জীবনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। তবে এ সময়ে তাই তিনি কোনোপ্রকার জামানত বা বন্ধক ছাড়াই জামানত সুদে গরিবের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করেন। এইভাবেই ড. মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর হাতে ক্ষুদ্র ঋণের পথযাত্রা শুরু হয়। আর বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্র ঋণের ধারণাটি দারিদ্র নিরসনে দৃঢ় ও সমাদৃত হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ একটি চমৎকার 'সামাজিক ব্যবসা' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জোবরা গ্রামের দরিদ্র মানুষের ঋণ শোধের জন্য ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি জনতা ব্যাংক থেকে প্রথম ঋণ পান। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি তাঁর প্রকল্পের জন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দরিদ্রদের বাণিজ্যিক ঋণের চেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়া শুরু করে। এরপর তিনি গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স জারি করে এবং এটি একটি স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গ্রামীণ ব্যাংক তার কার্যক্রমের জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হলো নোবেল শান্তি পুরস্কার।
ইউল ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা:
২০০৬ সালে, ঢাকা ইউল ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা সম্পর্কিত গবেষণার জন্য এটি একটি পিঠ দিক। প্রতিষ্ঠানটি দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাস্থ্যর ক্ষেত্রে কাজ করে। এটি প্রাথমিকভাবে অধ্যাপক ইউনুস ল্যাবরেটরি এবং তাঁর সহকর্মীদের সামাজিক ব্যবসার উপর বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস আর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন মিসেস সায়েদা মোমেন। এই প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা, শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ প্রদান করে। এটি দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, গ্রামীণ উন্নয়ন, মানব অধিকার, সামাজিক ব্যবসা, এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করে। ইউল ল্যাবরেটরি সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সামাজিক বিষয়গুলোর সমাধান প্রদান করে।
তিন শূন্য তত্ত্ব:
ড. মুহাম্মদ ইউনুস ল্যাবরেটরি গবেষণার মধ্যে তিন শূন্য তত্ত্বের উদ্ভাবন। যা সামাজিক সমস্যার পরিবর্তন সাধন করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, পৃথিবীতে বসবাস উন্নত করার জন্য কোনো নেতিবাচক কাজ করা যাবে না।
২০১৫' উদযাপনকালে তিনি এই তত্ত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। ড. মুহাম্মদ ইউনুস-এর ভাষায়, এই তিনটি শূন্য অর্জন করতে আমাদের প্রয়োজন তারুণ্য, যদি এই পৃথিবী হয় টেকসই ও সমৃদ্ধ। সামাজিক ব্যবসায়, যদি এই পৃথিবী গড়তে তারুণ্য শক্তির কোনো বিকল্প নেই। এই তত্ত্বটি বিভিন্ন দেশের সরকারি এবং বেসরকারী খাতসমূহ গ্রহণ করেছে এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করছে। এ তত্ত্বটির লক্ষ্য এমন একটি বিশ্ব নির্মাণ যেখানে থাকবে না দারিদ্র্যের অভিশাপ, বেকারত্বের গ্লানি আর পরিবেশের সাম্যহীনতা।
নারীর ক্ষমতায়ন:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বগুলো যেমন উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে ঠিক তেমনি ভূমিকা পালন করছে নারীর ক্ষমতায়নে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ৯৭% ঋণগ্রহীতা হচ্ছে নারী। এই নারীরা অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে যেমন নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করছে ঠিক তেমনি সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা, একজন নারী যখন তাঁর পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করবে তখন সে নারী আর বোঝা নয়; বরং সম্পদ। আর একটি পরিবার যখন অর্থনৈতিক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হবে, সে তখন সামাজিক পরিবর্তনে সচেষ্ট হবে। ফলত দেশের বেকারত্ব ঘুচবে, আয় বাড়বে। সহজে পরিবর্তন হবে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থান।
গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন:
সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের ফলে গত ৫ই আগস্ট, ২০২৪ সালে আওয়ামী সরকার পদত্যাগ করেন। ফলে দেশ হয়ে পড়ে নেতৃত্বশূন্য। এমতাবস্থায় দেশের ছাত্র-জনতার আহ্বানে গত ৮ই আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এখানেও রয়েছে তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার পুনরায় প্রতিষ্ঠা, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, তরুণদের স্বপ্নের দেশের বাস্তবায়ন প্রভৃতি লক্ষ্যেই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত ১৭ আগস্ট, ২০২৪ সালে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত 'থার্ড ভয়েস অভ গ্লোবাল সাউথ সামিট ২০২৪'-এর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে তিনি ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। গ্লোবাল সাউথের নেতাদের ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম এবং ১২-১০ বছর বয়সি শিশুরা ৪০০ বছর পরের পুরো মানব সভ্যতাকে ও নারী জাতিকে দেখতে। একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ছবি এঁকেছে। এর জন্য তাদের কোনো সুননির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। কারণ তারা মনে করে বাজেট সীমাবদ্ধ নয়। এই পৃথিবী বিশ্বের এককভাবে প্রতিভাসের আগে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও দীর্ঘ। তাঁর মতে, বাংলাদেশের তরুণদেরকে দেখানোর লেখা পড়ে যে-কেউ বুঝতে পারবে, তারা কী স্বপ্ন দেখছে। তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতির জন্যই কাজ করেছেন। সুদি কারবার কোনো সুযোগ এখানে নেই। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য। অর্থাৎ, সম্মিলিতভাবে কোনো তুলে সবাই মিলে একা হয়ে গেলে সবার পক্ষেই হলো এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
অত্যন্ত মেধাবী, সৎ ও গুণী এ মানুষটি জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হলো ২০০৬ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ নোবেল পুরস্কার। দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এ পুরস্কার লাভ করেন। যা বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে নিয়ে আসে। ১৯৭৮ সাল থেকে বহুবার সময় পর্যন্ত তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রায় ৭০টি পুরস্কার অর্জন করেন। যেমন- ১৯৯৪ সালে ম্যানিলায় 'র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার', ফিলিপাইন; ১৯৯৫ সাল 'স্বাধীনতা পুরস্কার', বাংলাদেশ; ১৯৯৫ সালে 'ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার'। ২০০৬ সালে 'টাইম' ম্যাগাজিন তাঁকে শীর্ষ ১২ জন বাণিজ্যিক নেতার মধ্যে স্থান দেয়। 'ফোর্বস' ৫০ বছরের নায়কের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন, তিনি সামাজিক বেসায়িক ব্যাংক ড্যানিশম্যানদের একজন শ্রেষ্ঠ উদ্যম পুরস্কারই লাভ করেন। একই বছর তিনি 'প্রোজেক্ট ইমপ্যাক্ট' সম্মানে ভূষিত হন। প্রোজেক্ট ইমপ্যাক্ট হলো একটি আন্তর্জাতিক সোশ্যাল ইনোভেশন প্ল্যাটফর্ম। এছাড়া তিনি 'ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন' পুরস্কার লাভ করেন। ২০১২ সালে 'ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স' থেকে 'গ্লোবাল সিটিজেন' পুরস্কার লাভ করেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬৩টি সম্মানসূচক ডক্টরেট এবং উপাচার্য শ্রী পুরস্কারও লাভ করেছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর এই ৮৫ বছরের জীবনে যেসব কাজ করেছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা, তেমনি অনেক গ্রন্থও রচিত হয়েছে। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো:
Three farmers of Jobra (১৯৭৯), Planning in Bangladesh: Format, Technique and Priority, and other Essays; Rural Studies project (১৯৭৯), Grameen Bank, As I See It (১৯৯৪), Banker to the Poor Microlending and the Battle Against World poverty (২০০৩), A world of three zero: The new economics of zero poverty, zero unemployment, and zero carbon emissions প্রভৃতি।
ব্যক্তিগত জীবন:
১৯৬৭ সালে এই খ্যাতিমান ব্যক্তি যখন ভ্যান্ডার বিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছিলেন তখন তাঁর সাথে পরিচয় হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়ান সাহিত্যের ছাত্রী ভেরা ফরোস্টেনকোর সাথে। তাঁরা ১৯৭০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের মেয়ে মনিকা ইউনূসের জন্মের কয়েক মাস পরে ১৯৭৯ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আফরোজি ইউনূসকে বিয়ে করেন। তাদের ঘর আলো করে ১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন দীনা আফরোজ ইউনূস।
উপসংহার:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম, এক বিস্ময়ের নাম। তিনি এক আলোক দিশারি, আত্মমানবতার সেবক, নারীর ক্ষমতায়নের সার্থক রূপকার। যাঁর জাদুরস্পর্শে অসংখ্য মানুষের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। আজ তারা দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাত থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ও জাতির আর্থসামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। মানুষকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে এবং বেকারত্বের অবসান ঘটাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক অনন্য নাম। তাই বাঙালি জাতি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তিনিও বাংলাদেশের মানুষকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন। আর তাই তো জাতির ক্রান্তিলগ্নে তিনি আবারও আবির্ভূত হয়েছেন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে।
Post a Comment