কৃষি তথ্য ও সেবা প্রাপ্তিতে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম ও অবস্থান উল্লেখ করা হলো।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এবং কৃষিসংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কাজ হলো নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা এবং গ্রহীতার উপযোগী আকারে সম্প্রসারণ কর্মীর নিকট হস্তান্তর করা। নিচে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের তালিকা এবং উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি উল্লেখ করা হলো:
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের নাম
দুইটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বর্ণনা দেওয়া হল।
(ক) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI-Bangladesh Agricultural Research Institute)
এটি দেশের সর্ববৃহৎ কৃষিবিষয়ক বহুমুখী গবেষণা প্রতিষ্ঠান যা ১৩০টিরও অধিক ফসলের কৃষিবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ প্রতিষ্ঠানের তিনটি প্রধান শাখা হলো: গবেষণা শাখা, শিক্ষা শাখা ও প্রশিক্ষণ শাখা। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদবি হলো মহাপরিচালক।
১৯৬৬ সালে ঢাকায় জয়দেবপুরে ৬৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঢাকা ফার্ম নামে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ডাইরেক্টরেট অব এগ্রিকালচার বিলুপ্ত হয় এবং ১৯৭৬ সালে পরিপূর্ণরূপে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ৭টি বিশেষায়িত ফসল গবেষণা কেন্দ্র, ১৭টি বিভাগ, ৭টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ২৮টি উপকেন্দ্র ও ৯টি ফার্মিং সিস্টেম সাইট রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান ধান, পাট, ইক্ষু ও চা ব্যতীত বাকি প্রায় সব দানাজাতীয় ফসল, তেলবীজ, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল ও মশলাসহ শস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন, কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, সার ব্যবস্থাপনা, বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ক গবেষণা করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি প্রধানত তিনটি উইং-এর মাধ্যমে যাবতীয় কার্যাবলি সম্পন্ন করে থাকে। যথা-
১. গবেষণা উইং: এর অধীনে ১৫টি বিভাগ, ৬টি কেন্দ্র, ৬টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ২৪টি উপকেন্দ্র, ৯টি এফএসআরডি এবং ৭২টি এমএলটি কেন্দ্রের আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে গবেষণা করে।
২. সেবা ও সরবরাহ উইং: এর অধীনে গবেষণা কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ সরবরাহ এবং অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
৩. প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ উইং : এর আওতায় কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ ও এনজিও কর্মীসহ কৃষকদের বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি
১. ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়ন সাধন করা।
২. নির্বাচিত ও উদ্ভাবিত জাতসমূহ চাষাবাদের জন্যে অনুমোদনের ব্যবস্থা করা।
৩. বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প তদারকিকরণ ও পরামর্শ প্রদান।
৪. ফসল অনুসারে সারের পরিমাণ নির্ধারণ ও সার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নয়ন।
৫. চাষাবাদ ও পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র উদ্ভাবন করা।
৬. কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার কৌশল উদ্ভাবন করা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরণ।
৭. কৃষি উন্নয়ন সংক্রান্ত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা প্রভৃতির আয়োজন করা।
৮. চাষাবাদবিষয়ক পুস্তিকা ম্যানুয়াল, প্রতিবেদন, জার্নাল প্রভৃতি প্রকাশ করা।
৯. উন্নত প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্যে মাঠ দিবসের আয়োজন করা।
১০. শস্যবিন্যাস পদ্ধতির আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন।
(খ) বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI- Bangladesh Rice Research Institute)
বাংলাদেশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭০ সালে বর্তমান গাজীপুর জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে এ প্রতিষ্ঠানের ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এগুলো হলো- রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা হবিগঞ্জ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরা জেলায়। এ প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত শতাধিক আধুনিক জাতের উচ্চফলনশীল ধান উদ্ভাবন করেছে। এছাড়াও মৃত্তিকা, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, চাষাবাদ পদ্ধতি, পোকামাড়ক ও রোগবালাই দমন ব্যবস্থাপনা, কৃষি খামার যন্ত্রপাতি ও শস্যবিন্যাস বিষয়ে অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবিত জাতগুলো বোরো, আউশ ও আমন তিন মৌসুমেই চাষ করা হয়। ব্রির উদ্ভাবিত এসব জাতের মধ্যে সুগন্ধময়, জিঙ্ক সমৃদ্ধ, লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু জাতও রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভকরেছে।
বাংলাদেশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য
১. ধানের নতুন নতুন উফশীজাত উদ্ভাবন করা।
২. পোকামাকড় ও রোগ-বালাইয়ের হাত থেকে ধান ফসল রক্ষার জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা।
৩. ধান চাষবিষয়ক প্রযুক্তি কৃষকদের মাঝে হস্তান্তরের জন্যে মাঠ দিবসের আয়োজন করা।
৪. ধান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা ও সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার নির্দেশনা প্রদান করা।
৫. IRRI-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তথ্য, জাত ও কলাকৌশল আদান-প্রদান করা।
৬. ধান চাষ সম্পর্কিত লিফলেট, পুস্তিকা, বই প্রকাশ ও বিতরণ করা।
৭. প্রদর্শনী প্লট তৈরি করে কৃষকের মাঝে উন্নত জাত ও চাষাবাদের প্রযুক্তি বিস্তারে সহায়তা করা।
৮. ধানজাতপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র উদ্ভাবন ও ধানের বহুমুখী ব্যবহার কৌশল উদ্ভাবন।
৯. প্রতিকূল অবস্থা থেকে ধান ফসলকে রক্ষা করার উন্নত কলাকৌশল উদ্ভাবন করা।
১০. আঞ্চলিক উপকেন্দ্রগুলোর ধান উৎপাদনে সমস্যার দিক নির্দেশনা প্রদান করে।
Post a Comment