AF EDU 24-এফ এডু ২৪(afedu24.blogspot.com)
--:--:--

সর্বশেষ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ।

Causes of Second World War


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপে আবার সংকট সূচনা হয়। বিশেষ করে জার্মানিতে উগ্র জাতীয়তাবাদ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।১৯২৯-১৯৩০ সালের মহামন্দা বিভিন্ন দেশে দুরবস্থা সৃষ্টি করলে ফ্যাসিস্ট দল ও নাসি দল এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে এবং জনসমর্থনকে ব্যবহার করে ইতালি ও জার্মানিতে ক্ষমতা দখল করে। ইতালিতে মুসোলিনী এবং জার্মানিতে হিটলার ব্যাপক সমরসজ্জা শুরু করেন। সমগ্র ইউরোপ দুটি পরস্পরবিরোধী সামরিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্বের ৬১টি দেশ এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৬ বছর চলার পর ১৯৪৫ সালে তার অবসান ঘটে। যুদ্ধে প্রধানত ২টি পক্ষ ছিল। জার্মানি, ইতালি ও জাপান ছিল এক পক্ষে যারা অক্ষশক্তি নামে পরিচিত এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স, USA এবং রাশিয়া ছিল একপক্ষ যারা মিত্রশক্তি জোট নামে পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) 
অক্ষশক্তি জোট

জার্মানি, ইতালি, জাপান, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া ও বুলগেরিয়া

মিত্র শক্তি জোট 

ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সোভিয়েত রাশিয়া


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহ (Causes of The Second World War)
বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সংঘাত এবং ক্ষয়ক্ষতি পৃথিবীর কোনো দুঃখজনক ঘটনার সাথে তুলনা করা যায় না। কারণ এ যুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অপেক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং কয়েকগুণ বেশি ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। এ যুদ্ধ জল, স্থল অর্থাৎ সাগর-মহাসাগর ছাড়িয়ে দেশ-মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ যুদ্ধ অন্তরীক্ষ পর্যন্ত বাদ পড়েনি। সবচেয়ে কষ্টের ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘা সারতে না সারতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বিশ্ব আতঙ্কিত হয়। মানুষ সন্ত্রস্ত হয়। ৬১টি রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়।যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মানুষের প্রাণ নষ্ট হয়, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের শান্তি বিঘ্নিত হয়। বহু মানুষ পঙ্গু হয়। অসহায়ত্বের বিভীষিকাময় অবস্থায় কাটায় পৃথিবীর মানুষ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। আবার যুদ্ধের কারণও খুব ছোট নয়।মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপ্রত্যাশিত সমস্যা থেকে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে বিকশিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জটিলতা ও কঠিন ঘটনাবলি থেকেই এ রকম সর্বনাশী যুদ্ধের উদ্ভব হয়েছিল।

১. ভার্সাই সন্ধির ত্রুটি:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তিরা পরাজিত জার্মানির ওপর যে ভার্সাইয়ের সন্ধি চাপিয়ে দেয় তা জার্মানির ক্ষতিকর করতে বাধ্য ছিল না। কারণ এ সন্ধির দ্বারা জার্মানির ওপর ঘোর অবিচার করা হয়। ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানিকে চিরতরে পঙ্গু করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তাই জার্মানির জাতি ভার্সাই সন্ধি ভেঙে দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে যায়। জার্মানির জাতীয়তাবাদী দলগুলো জনগণকে বোঝাতে থাকে যে, ভার্সাই সন্ধি না ভাঙলে জার্মানির সম্মানের সমাধান হবে না এবং জার্মানির প্রকৃত মুক্তি আসবে না। এ ভার্সাই বিরোধী প্রচার-প্রচারণা জার্মানির জাতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

২. ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন: 

ভাইমার প্রজাতন্ত্র ছিল সহনশীল ও শান্তিবাদী। হিটলার ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করেন। ভাইমার প্রজাতন্ত্রই ভার্সাই সন্ধিতে স্বাক্ষর করে এবং ভাইমার পার্লামেন্টে এ সন্ধি অনুমোদিত হয়। ভাইমার সরকার এ সন্ধির সংশোধন চেয়েছিল, তারা ভার্সাই সন্ধি ভেঙে ফেলতে চায়নি। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, নাৎসি দল ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়। 

৩. হিটলারের ভার্সাই সন্ধির বিরোধিতা: 

১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির শাসনক্ষমতা লাভ করেন। আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায়নীতিকে তিনি উপেক্ষা করে চলতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। তিনি জার্মানি তথা বিশ্বের জনমতকে ভার্সাই সন্ধির বিরুদ্ধে নিয়ে যান। অতঃপর হিটলার ইউরোপের শক্তিসাম্য ভেঙে জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন। কাজেই হিটলার ইউরোপের শাস্তি ও স্থিতিবস্থাকে ভেঙে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রস্তুত করেন।

 ৪. শক্তিসাম্য ধ্বংস: 

হিটলার যখন কোনো দেশের সাথে চুক্তি করতেন তখন তিনি মনে মনে ভাবতেন, দরকার হলে এ সন্ধি তিনি ভেঙে দেবেন। তিনি পোল-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি করেন, মিউনিখ চুক্তি করেন ও রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে সুবিধাজনক সময়ে তা আবার ভেঙে দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি মারাত্মক কূটনীতির দ্বারা ইউরোপের শক্তিসাম্য ভেঙে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আলিঙ্গন করেন। 

৫. ব্রিটেনের তোষণনীতি: 

ব্রিটেনের টোরি মন্ত্রিসভা মনে করত, রাশিয়ার সাম্যবাদকে রোধ করতে হলে নাৎসি জার্মানিকে ব্যবহার করা দরকার। জার্মানি দুর্বল হয়ে পড়লে পূর্ব ইউরোপ থেকে রাশিয়ার সাম্যবাদ জার্মানির পথে পশ্চিমে ঢুকে পড়বে। এর ফলে পশ্চিমের বুর্জোয়া গণতন্ত্র ধ্বংস হতে পারে। সুতরাং ব্রিটেন জার্মানি তোষণনীতির দ্বারা ভার্সাই সন্ধির বিরুদ্ধে জার্মানির ন্যায্য জাতীয়তাবাদী দাবিগুলো পূরণের নীতি নেন। এজন্য ব্রিটেন জার্মানির শক্তি ও অস্ত্র বৃদ্ধিতে বাধা দেয়নি। নাৎসি জার্মানি ভার্সাই সন্ধি ভেঙে একের পর এক রাজ্য দখল করলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বার লেইন নিশ্চেষ্ট থাকেন। তিনি মিউনিখ চুক্তির দ্বারা জার্মানিকে সুদেতান অঞ্চল ছেড়ে দেন। এ তোষণনীতি জার্মানিকে আরও সাহসী করে তোলে, যা পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। 

৬. ইতালি ও জাপানের আগ্রাসন নীতি পূর্ব এশিয়ায় জাপানের সামাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং ইতালির আগ্রাসন নীতি বিশ্বশান্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ, আলবেনিয়া অধিকার ও স্পেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক শান্তিকে বিঘ্নিত করে। অন্যদিকে, জাপান কর্তৃক ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ এবং ১৯৩৬ সালে দ্বিতীয়বার চীন আক্রমণ এশিয়ার শান্তিকে বিঘ্নিত করে। জাপান, জার্মানি ও ইতালি অক্ষশক্তি জোট গঠন করে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালালে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে।

 ৭. সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সংঘাত: 

সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ব্রিটেন ও ফরাসি শক্তি নিজ নিজ সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যকে বৃদ্ধি করে বিশ্বে তাদের আধিপত্য রক্ষা করে চলতে থাকে। তারা মনে করে, জার্মানির শক্তি বাড়লে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বাণিজ্য ও উপনিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। জাপানও এসময় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নীতি গ্রহণ করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়ে আসে।

 ৮. আদর্শগত দ্বন্দ্ব: 

পৃথিবীর প্রধান শক্তিবর্গ তখন পরস্পরবিরোধী আদর্শের ভিত্তিতে দুটি বিরোধী শিবিরে পরিণত হয়েছিল। একদিকে, জার্মানি-ইতালি-জাপান অক্ষশক্তিবর্গ একক অধিনায়কত্ব, স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদের ধারক-বাহক ছিল এবং অন্যদিকে, ব্রিটেন-ফ্রান্স-আমেরিকা ছিল গণতন্ত্রের সমর্থক। সাম্যবাদী সোভিয়েত রাশিয়ার পরিস্থিতি ছিল আর এক রকম। একক অধিনায়কত্ব ও গণতন্ত্র এ দুটিই ছিল সাম্যবাদের বিরোধী। এ রকম পরিস্থিতিতে রাশিয়া বিপদের হাত থেকে রক্ষার জন্য জার্মানি-রাশিয়া অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু শেষে আবার গণতান্ত্রিক দেশসমূহের সাথেও যোগদান করতে বাধ্য হয়। সুতরাং এ আদর্শগত দ্বন্দ্বই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ।


৯. হিটলার কর্তৃক অস্ট্রিয়া দখল ভার্সাই সন্ধির সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করলেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স এবং ইউরোপের অপর কোনো রাষ্ট্র এতে কোনো বাধা প্রদান করেনি। মুসোলিনীও অস্ট্রিয়া দখলের কোনো প্রতিবাদ করেননি। কারণ তার আবিসিনিয়া দখলের জন্য হিটলারের নৈতিক সমর্থন ছিল। 

১০. হিটলার কর্তৃক সুদেতান দখল চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলের অধিবাসীর অধিকাংশই ছিল জার্মান জাতির লোক। সুতরাং হিটলার ১৯৩৮ সালে সুদেতান অঞ্চল দাবি করলেন। ১৯৩৮ সালেই মিউনিখ চুক্তি (Munic Pact) দ্বারা ইতালি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন সুদান অঞ্চল জার্মানিকে দান করতে চেকোস্লোভাকিয়াকে সম্মত করিয়েছিল। চেকোস্লোভাকিয়া জার্মানি কর্তৃক আক্রান্ত হলে রাশিয়া এসময় ফ্রান্সের সাথে চেক্লোস্লোভাকিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। 

১১. হিটলার কর্তৃক চেকোস্লোভাকিয়া ও মেমেল দখল সুদেতান অঞ্চল দখলের ৬ মাসের মধ্যে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার অবশিষ্ট অংশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন। এভাবে ইউরোপের শক্তিবর্গ কোনো প্রতিরোধ না করার কারণে হিটলার আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। অতঃপর তিনি লিথুনিয়ার নিকট হতে মেমেল দখল করলেন।

 ১২. রাশিয়া-জার্মানি অনাক্রমণ চুক্তি:

 হিটলারের রাজ্যলিপ্সা বেড়ে যায় এবং পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দরটি দাবি করেন। এ বিপদের মুহূর্তে পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স একটি আত্মরক্ষামূলক পরস্পর সামরিক সাহায্যের চুক্তি সম্পাদন করে। রাশিয়া এসময়ে জার্মানির সাথে 'অনাক্রমণ চুক্তি' স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি ইঙ্গ-ফরাসি মিত্রপক্ষের জন্য কূটনৈতিক পরাজয় এবং জার্মানির জন্য শুভ লক্ষণ ছিল। 

১৩. হিটলার কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণ: 

নাৎসিবাদের জনক হিটলার দিন দিন অনেক শক্তি সঞ্চয় করেন। অতঃপর দাবি পূরণে অস্বীকার করলে হিটলার ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ইংল্যান্ডও জার্মানির বিরুদ্ধে ৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং কয়েক ঘণ্টা পর ফ্রান্সও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই ১৯৩৯ সালে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় এবং ১৯৪৫ সালে এ যুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটে।

 ১৪. উগ্র জাতীয়তাবাদ: 

উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মান দার্শনিক, পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকগণ এ কথা প্রচার করতে থাকেন যে জার্মানগণ হচ্ছে বিশুদ্ধ আর্য এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি। ক্রমে এ জাতীয়তাবাদী ধারণা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানরা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করে। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার জাতিগত বিদ্বেষ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ অবস্থাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post