AF EDU 24-এফ এডু ২৪(afedu24.blogspot.com)
--:--:--

সর্বশেষ

মুরগির ৫ টি সাধারণ রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার/ চিকিৎসা।

5 Chicken Diseases
মুরগি


নিচে মুরগির গুরুত্বপূর্ণ ৫ টি রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার/চিকিৎসা আলোচনা করা হলো।

ক. মুরগির রানীক্ষেত/চুনা হাগা রোগ (New Castle Disease)

মোরগ-মুরগির সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে রানীক্ষেত অন্যতম। বয়স্ক মুরগির চেয়ে বাচ্চা মুরগি এ রোগে বেশি সংবেদনশীল। এ রোগ প্রথমে মধ্য ইংল্যান্ডের নিউক্যাসলে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ভারতের রানীক্ষেত নামক স্থানে এ রোগ প্রথম শনাক্ত হয়, তাই আমাদের দেশে একে রানীক্ষেত রোগ বলে। গ্রামাঞ্চলে এ রোগকে চুনা হাগা রোগ বলে। গ্রীষ্ম ও বসন্তকালে আমাদের দেশে এ রোগ বেশি হয়।

রোগ সংক্রমণ: 

New castle disease virus দ্বারা এ রোগটি হয়ে থাকে। আক্রান্ত বা বাহক পাখির শ্বাসতন্ত্রে নিঃসৃত পদার্থ ও মলের মাধ্যমে ভাইরাস নির্গত হয় যা শ্বাস গ্রহণের সময় বাতাসের বা খাবারের সাথে মুখ দিয়ে সুস্থ মুরগির দেহে প্রবেশ করে।

রোগ লক্ষণ

১. আক্রান্ত পাখি দল ছেড়ে ঘরের কোণে ঝিমানো অবস্থায় থাকে।
২. সুস্থ পাখি হঠাৎ কক্ শব্দে ওপরে লাফ দেয়, তারপর মারা যায়।
৩. শ্বাসতন্ত্রে আক্রান্তের লক্ষণ প্রকাশ পায়, ফলে শ্বাসকষ্ট হয়।
৪. ঘাড়, ডানা ও পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। নাক দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরে।
৫. খাদ্যনালি আক্রান্তের ফলে সাদা চুনের মতো মল ত্যাগ করে।
৬. মলের রং সবুজ অথবা সবুজ ও হলুদ বর্ণের মিশ্রণ দেখা যায়।
৭. মুরগির ডিম উৎপাদন কমে যায়। এমনকি বন্ধও হয়ে যায়।
৮. চোখ ফুলে ওঠে, কানের লতি ও মাথার ঝুঁটি কালচে বর্ণ হয়।
৯. ঘাড় বাঁকা হয়ে যায়, মাথা ঘুরাতে থাকে এবং খুঁড়িয়ে চলে।
১০. দুর্গন্ধযুক্ত পাতলা মল মুরগির পেছনের পালকে লেগে থাকে। একে চুনা হাগাও বলে।

চিকিৎসা/রোগ প্রতিরোধ

স্বাস্থ্যসম্মত পালনব্যবস্থা এবং টিকা প্রদানের মাধ্যমে এ রোগের প্রতিরোধ করা যায়। রানীক্ষেত রোগের দু ধরনের টিকা পাওয়া যায়। টিকা দুটি হলো:
(ক) বিসিআরডিভি (Baby Chick Ranikhet Disease Vaccine-BCRDV): এ টিকাবীজের প্রতিটি ভায়ালে ১ মি.লি. মূল টিকাবীজ থাকে। টিকাবীজ ৬ মি.লি. পরিস্রুত পানিতে ভালোভাবে মিশাতে হয়। তারপর ৭ দিন ও ২১ দিন বয়সের প্রতিটি বাচ্চা মুরগির প্রতি চোখে ১ ফোঁটা করে দিতে হয়। এ টিকার কার্যকারিতা দু মাসের বেশি।
(খ) আরডিভি (Ranikhet DiseaseVaccine-RDV): সাদা কাচের এম্পুলে ০.৫ সিসি হারে এ টিকাবীজ থাকে। এর সাথে ১০০ সিসি পরিস্রুত পানি মিশিয়ে ১০০ মাত্রা করা হয়। এ টিকা দু মাসের বেশি বয়সের প্রতিটি মুরগির হবে মাঝে ১ সিসি করে ইনজেকশন দিতে হয়। ৬ মাস পরপর এ টিকা দেওয়ার নিয়ম।
রোগীর প্রতিকার
(১) আক্রান্ত মুরগিকে সুস্থ পাখি থেকে পৃথক করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
(২) মৃত মুরগি যেখানে সেখানে না ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
(৩) কিছু অ্যান্টিবায়োটিক যেমন: এনরোসিন সিরাপ খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়।
(৪) আক্রান্ত ও সুস্থ উভয় মুরগিকে মাঝেমধ্যে পটাস মিলালো পানি খাওয়ানো যেতে পারে।

খ. মুরগির বসন্ত রোগ (Fowl Pox)

রোগের কারণ: এটি এভিয়ান Herpes নামক ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক রোগ। যেকোনো বয়সের মুরগি ও কবুতরের এ রোগ হয়। তবে অল্প বয়সের মুরগির মৃত্যুর হার বেশি। আমাদের দেশে বর্ষা ও শীতকালে এ রোগের প্রকোপ দেখা যায়। আক্রান্ত পাখির সংস্পর্শ ও বাতাসের মাধ্যমে এ রোগের জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়।

রোগ লক্ষণ

১. প্রথমে বসন্তের ছোটো ছোটো গুটি মাথার ঝুঁটি, গলকম্বল ও পায়ের কাছে দেখা দেয়।
২. চোখের চারপাশে ক্ষত হলে চোখ আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
৩. প্রাথমিক অবস্থায় গুটিগুলো লাল এবং পরে কালো বর্ণ হয়।
৪. আক্রমণ তীব্র হলে ছোটো বাচ্চাগুলো মারা যায়।
৫. মুখের ভেতর অনেক সময় ঘা হয় বলে মুরগি খেতে পারে না।
৬. চোখ ও নাক থেকে লালা নিঃসৃত হয়, চোখ ফুলে ওঠে ও শক্ত হয়।
৭. শ্বাসনালি আক্রান্তের ফলে মুরগির শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

রোগ প্রতিরোধ/প্রতিকার: 

সময়মতো প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে। বসন্তের গুটি বা ঘা ডেটল, আয়োডিন বা পটাশের পানি দ্বারা দিনে ২/৩ বার ধুয়ে দিতে হবে। আক্রান্ত মুরগি সুস্থগুলো থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। মুরগির ঘর জীবাণুনাশক ওষুধ দ্বারা মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করে ধুতে হবে। মৃত মুরগি মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। Renamycin মলম আক্রান্ত স্থানে লাগালে দ্রুত ক্ষত শুকিয়ে যাবে।

গ. বার্ড ফ্লু (Avian influenza/ Bird Flue)

এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু বর্তমানে পোল্ট্রির জন্য একটা মারাত্মক সংক্রামক রোগ। পৃথিবীব্যাপী এ রোগের বিস্তার। পোল্ট্রি শিল্পের জন্য বর্তমানে এ রোগ মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। ১৯৬৮ সালে হংকং-এ প্রথম এ রোগ শনাক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্স-সাভার ঢাকাতে এ রোগ প্রথম ধরা পড়ে।

রোগের কারণ:

 বার্ড ফ্লু রোগটি "এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা" ভাইরাসজনিত। এ ভাইরাসের দুটি টাইপ বা ধরন রয়েছে। যথা : সাবটাইপ H5 এবং H7। আক্রান্ত পাখি এবং খামারে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জামাদির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ

১. আক্রান্ত পাখি খুবই দুর্বল এবং পালক উসকোখুসকো হয়।
২. খাবারে অনীহা দেখা দেয় এবং ডিম পাড়া কমে যায়।
৩. চোখ লাল হয়ে যায় এবং চারদিক ফুলে চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
৪. মাথা, মাথার ঝুঁটি, কম্ব ইত্যাদিতে পানি জমে ফুলে যায়।
৫. শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হলে নাক ও মুখ দিয়ে পানি পড়ে।
৬. ঝুঁটি, কান্ত ও শ্বাসতন্ত্রে হয় এবং পালার মধ্যে রক্তক্ষয় হয়।
৭. পায়ের পাতা ও হক জয়েন্টের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে রক্ত জমে।

ঘ. মুরগির গামবোরো রোগ (Gumboro Disease)

রোগের কারণ: 

যুক্তরাষ্ট্রের গামবোরো শহরের নিকটে ১৯৬২ সালে সর্বপ্রথম এ রোগ আবিষ্কৃত হয়। এটি Birna virus দ্বারা সংঘটিত অত্যন্ত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এ রোগের অপর নাম ইনফেকসাস বারসাল ডিজিস আমাদের দেশে সর্বপ্রথম ১৯৯২ সালে এ রোগ দেখা যায়।

রোগ সংক্রমণ: 

আক্রান্ত মুরগির সংস্পর্শে বা বাতাসের মাধ্যমে, ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বহিরাগত পাখি, পায়খানা, দূষিত খাবার ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগ সংক্রমিত হয়।

রোগ লক্ষণ

১. রোগাক্রান্ত পাখির পালক উসকোখুসকো দেখা যায়।
২. পাখি খাওয়া-বন্ধ করে চুপচাপ হয়ে ঘরের কোণে বসে থাকে।
৩. ভীষণ দুর্গন্ধযুক্ত পাতলা পায়খানা করে। পায়খানা দ্বারা মুরগির পায়ুস্থান সর্বদা ময়লাযুক্ত থাকে।
৪. মুরগি মাটিতে শুইয়ে পড়ে এবং পানিশূন্যতার কারণে মারা যায়।
৫. ব্রয়লারের ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধির হার দারুণভাবে কমে যায়।
৬. প্রথমে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে পরে আবার স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে চলে যায়।
৭. পায়খানার সাথে সাদা শ্লেষ্মা ও রক্ত পড়ে।

রোগের প্রতিকার/চিকিৎসা: 

স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং টিকা দেয়ার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়। জন্মের পর থেকে ১৪ দিনের মধ্যে গামবোরো ভ্যাকসিন প্রদান করতে হয়। বাচ্চার বয়স যখন ১৪ দিন হবে, ঐ দিন থেকে ২ দিন পরপর ৩ মাস পর্যন্ত ভিটামিন ও স্যালাইন খাওয়াতে হবে। মুরগির খামার স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

ঙ. মুরগির কলেরা রোগ (Fowl Cholera)

রোগের কারণ: 

এটি Pasteurella multocida নামক একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। বছরের যেকোনো সময় যেকোনো বয়সের হাঁস-মুরগি এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বাহক পাখির মল ও অন্যান্য নিঃসরণ দ্বারা, খাদ্য, পানীয় ও পরিবেশ দূষিত হয়ে সুস্থ পাখিকে এ রোগ আক্রান্ত করে।

রোগ লক্ষণ

১. আক্রান্ত মুরগির সবুজ বা হলুদ বর্ণের ডায়রিয়া দেখা দেয়। মুরগির ঝুঁটি, গলকম্বল ও কানের লতি নীলাভ হয়।
২. তীব্র প্রকৃতির রোগে জ্বর, খাদ্য গ্রহণে অরুচি, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং হঠাৎ করে মারা যায়।
৩. নাকমুখ দিয়ে লালা ঝরে ও চোখ দিয়ে পানি পড়ে। মুরগির পালক উস্কোখুস্কো হয়।
৪. খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে মুরগি ঝিমাতে থাকে। মুরগির মুখমণ্ডল, মাথার ঝুঁটি ও চোখ মুখ ফুলে যায়।
৫. ২-৩ দিনের মধ্যে খামারের অধিকাংশ হাঁস-মুরগি মারা যায়।

রোগের প্রতিকার/চিকিৎসা:

 খামারের জৈব নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত বিধি মেনে চলা। অসুস্থ পাখি সুস্থ পাখি থেকে আলাদা করা। নিয়মিত ফাউল কলেরা প্রতিরোধক টিকার ব্যবস্থা করা। মৃত পাখি মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। ১০-৩০ মি.গ্রা. প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩ দিন খাওয়াতে হবে।

রোগ প্রতিরোধ/প্রতিকার

সময়মতো রোগ প্রতিষেধক টিকা দেওয়া। একদিন বয়সের বাচ্চার প্রতিষেধক হিসেবে বার্ড ফ্লু ইনজেকশন দিতে হবে। আক্রান্ত স্থান থেকে সুস্থগুলো আলাদা করে অন্য জায়গায় রেখে সুস্থগুলোর সাথে মিশতে দেওয়া যাবে না। আক্রান্ত পাখি থেকে সুস্থ পাখি আলাদা করে রাখতে হবে। পরিষ্কা-পরিচ্ছন্ন পালনব্যবস্থা গ্রহণ, জীব নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

Post a Comment

Previous Post Next Post