প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ:
পরোক্ষ কারণ (Indirect Cause)
অস্ট্রিয়ার যুবরাজ হত্যাকে কেন্দ্র করে তৎক্ষণাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলেও ইউরোপ এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল পূর্ববর্তী একশত বছর ধরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরোক্ষ কারণগুলো হলো-
৭. অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করে পশ্চাদপদ দেশগুলোর ওপর সাম্রাজ্যবাদী অধিকার বিস্তার করত। এই কারণে দেশগুলোর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় বিস্তার বৃদ্ধি ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দারুণ অসন্তোষ সৃষ্টি করে। প্রত্যেক দেশই শিল্পোৎপাদন যুদ্ধের প্রস্তুতি করতে থাকে। এ কারণে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধগুলো বড় ছিল না।
৮. গোপন কূটনীতি ও পরস্পর সন্দেহ: ইউরোপব্যাপী যখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, পারস্পরিক সন্দেহ যখন বৃদ্ধি পাচ্ছিল তখন আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার মতো কোনো সংস্থা বা মাধ্যম ছিল না। একই মন্ত্রিসভায় সকল সদস্যদের নিজ নিজ সরকার কী কী গোপন চুক্তি সম্পাদন করছেন তাও জানার সুযোগ ছিল না। চারদিকের সন্দেহের ধোঁয়ায় ইউরোপ তখন দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। সামরিক দিক দিয়ে ইউরোপ তখন বারুদের গোলায় পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় গোলায় বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অপেক্ষা শুধু সময়ের।
৯. সংবাদপত্রের ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহের মধ্যে সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অন্যতম। যেসব দেশকে শত্রুভাবাপন্ন মনে হতো সে দেশ সম্পর্কে সংবাদপত্র নানা প্রকার অসত্য ঘটনা প্রকাশ করে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে থাকে। কোনো কোনো সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে। আবার যেসব রাষ্ট্রের সাথে সরকার সমঝোতা করতে চেয়েছে সেখানেও সংবাদপত্র হয় সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করেছে অথবা যথেষ্ট ভালো বলে সমঝোতা করার পথকে পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে। এভাবে সংবাদপত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১০. সামাজিক ডারউইনবাদ: ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে জাতীয়তাবাদের মতো সামাজিক ডারউইনবাদ নামে এক সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণার জন্ম হয়। ইউরোপের রাজনৈতিক এলিটরা ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডারউইনের ভ্রান্ত বিবর্তনবাদের তত্ত্ব গ্রহণ করেন। ডারউইন যোগ্যতমদের টিকে থাকার পক্ষে (Survival of the fittest) মত প্রকাশ করেন। তিনি অভিমত দেন যে, "টিকে থাকার লড়াইয়ে শক্তিশালীদের হাতে দুর্বলদের ধ্বংস নিশ্চিত।" সামাজিক ডারউইনবাদ উপনিবেশ স্থাপনে জাতি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উৎসাহ দান করে। এ মতবাদ ঊনবিংশ শতাব্দীতে একটি বেপরোয়া মনোভাবের জন্ম দেয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের সমকক্ষ হতে না পারলে ধরে নেওয়া হতো, সে রাষ্ট্রের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।
১১. শ্লিফেন পরিকল্পনা: শ্লিফেন পরিকল্পনার উদ্যোক্তা ছিলেন জার্মান সমরনায়ক জেনারেল আলফ্রেড গ্রাফভন সিলাইফেন। তার উদ্ভাবিত পরিকল্পনা জার্মানিকে যুদ্ধে প্ররোচিত করে। শ্লিফেন পরিকল্পনায় (Schlieffen Plan) রাশিয়াকে তার বিপুল জনশক্তি মোতায়েনের সুযোগ না দিয়ে ফ্রান্সকে আক্রমণাত্মক বিভাদ থেকে বিদায় করে দেওয়ার সুবিধার কথা হয়। পরিকল্পনা বলা হয় ফ্রান্সকে বিদায় করে দেওয়ার পরই কেবল রুশ হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি তার সকল সম্পদ নিয়োজিত করতে পারবে। ১৯০৫ সালে অবসর গ্রহণের আগে তিনি এ পরিকল্পনা পেশ করেন। শ্লিফেন পরিকল্পনা জার্মান সামরিক পরিকল্পনাবিদদের যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য ফুটে ওঠা মাত্রই আমূল হামলা চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ উৎসাহিত করে। শ্লিফেন পরিকল্পনায় বলা হয়, অনিবার্য রাশিয়া সেনা মোতায়েনের সময় পাবে এবং রাশিয়াও সেনাবাহিনীতে তারবে জার্মানি ধ্বংস হবে। কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম সিলাইফেন পরিকল্পনা বাতিল করে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন, এ পরিকল্পনা বাতিল করতে হলে জার্মান সেনাবাহিনীকে পদানতি করতে হবে এবং জার্মানিকে একটি ঝুঁকির ভিতরে ফেলবে। অতঃপর ইউরোপের সকল রাষ্ট্র যুদ্ধের ব্যাপারে খেরির পরিভয় দিলেও জার্মানি কিন্তু খেরির পরিচয় দিতে পারেনি।
১২. ট্রিপল অ্যালায়েন্স: ১৮৮২ সালে বিসমার্ক ট্রিপল অ্যালায়েন্স বা ত্রিশক্তি চুক্তি সম্পাদন করেন। এ চুক্তি দ্বারা জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া অ্যাংগারের ব্যাপারে পরস্পর সামরিক সাহায্যদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এ চুক্তি সম্পাদনের পর ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও রাশিয়া প্রত্যেকেই একজভাবে থাকার বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
১৩. ট্রিপল আঁতাত: ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া পরস্পর মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ট্রিপল আঁতাত নামে এক মৈত্রী স্থাপন করে। ট্রিপল আঁতাত ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্সের প্রত্যুত্তর। ফলে সময় ইউরোপ 'ট্রিপল অ্যালায়েন্স' ও 'ট্রিপল আঁতাত'তে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
১৪. বলকান অঞ্চলে অস্থিরতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে তুর্কি সরকারের শাসন পরিচালনার অকর্মণ্যতা, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার পূর্বদিকে রাজ্য বিস্তারের ইচ্ছা, রাশিয়ার স্লাভ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার নীতি, ম্যাসিডন অধিকার নিয়ে সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রভৃতি বলকান অঞ্চলকে যুদ্ধের অগ্নিকাণ্ডে পরিণত করেছিল।
প্রত্যক্ষ কারণ (Direct Cause)
অস্ট্রিয়ার সার্বিয়া সমর্থক স্লাভরা গোপন সমিতি গঠন করে সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় নেয়। প্রাক্তন সামরিক কর্মীদের নিয়ে গঠিত এরকম একটি দলের নাম ছিল 'ব্লাক হ্যান্ড' যা সার্বিয়া থেকেই পরিচালনা করা হতো। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্চ ফার্ডিনান্ড ও তার স্ত্রী কাউন্টেস সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো ভ্রমণে এলে সার্বিয় সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন। এটি 'সারায়েভো হত্যাকাণ্ড' নামে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড অস্ট্রিয়াকে ক্ষিপ্ত করে তোলে এবং অস্ট্রিয়ার সরকার এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকেই দায়ী করে। অস্ট্রিয়ার সরকার জার্মানির সাহায্যের গোপন প্রতিশ্রুতি পেয়ে ১৯১৪ সালের ২৩ জুলাই সার্বিয়ার সরকারের নিকট কতকগুলো কাজের শর্ত সংবলিত এক চরমপত্র প্রেরণ করলেন। এ চরমপত্রে-
(ক) সার্বিয়া সরকারকে সারায়েভোর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে ঘোষণা প্রকাশ করতে বলা হয়।(খ) অস্ট্রিয়া বিরোধী প্রচারে তীব্র প্রতিবাদ করা হয়।(গ) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রচার কাজ চালানোর জন্য কয়েকজন সরকারি কর্মচারী ও স্কুল শিক্ষকদের পদচ্যুতি দাবি করা হয়।(ঘ) ফার্ডিনান্ডের হত্যার তদন্তের জন্য সরকারি কর্মচারীদের সাহায্য প্রদানের কথা বলা হয়।(৬) মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ চরমপত্রের উত্তর দিতে বলা হয়।
১৯১৪ সালের ২৫ জুলাই এ চরমপত্রের উত্তর প্রেরণ করেন সার্বিয়া সরকার। এ উত্তরে চরমপত্রের প্রায় সবগুলো দাবিই স্বীকার করে নেওয়া হয়। কিন্তু অপর কয়েকটি শর্ত মেনে নিলে সার্বিয়ার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতো। তাই সেগুলোর মীমাংসার জন্যও সার্বিয়া অস্ট্রিয়ার কাছে সময় চায় অথবা আন্তর্জাতিক কোনো বৈঠকে মীমাংসার দাবি জানায়। সার্বিয়ার এ উত্তর অস্ট্রিয়ার ভালো লাগেনি। অতঃপর ১৯১৪ সালের ২৬ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ দেওয়া হয়। অস্ট্রিয়া ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে।
Post a Comment